Friday, September 14, 2018

ট্রাম্পের ভারতঘেঁষা পাকিস্তানকে রাশিয়ামুখী করবে

SHARE


এশিয়ার দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান নিয়ে বিপজ্জনক এক খেলা করছেন ট্রাম্প। আর এ কাজে তাঁকে ভরসা করতে হচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের ওপর। দিন কয়েক আগে ট্রাম্প প্রশাসনে ঝড় তোলা নিউইয়র্ক টাইমসের উপসম্পাদকীয় প্রকাশের পরও কিছু মানুষের ওপর ট্রাম্পকে আস্থা রাখতে হয়েছে। ওই লেখনীতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই ট্রাম্পের ক্ষতিকর নির্দেশ ঠেকানোর মতো মানুষ তাঁর প্রশাসনে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এত কিছু জেনেও ট্রাম্পের পক্ষে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিস্তৃত কূটনৈতিক দুই ধাপ অতিক্রম করতে হলো ওই দুই কর্মকর্তাকে। এশিয়ার দুটি দেশ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘খেলা’র বিষয়টি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতামত বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে।
লেখক ডেভিড আ. অ্যান্ডেলমান লিখেছেন, কদিন আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে ভেঙিয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ওই আচরণ ভালোভাবে নেননি ভারতীয়রা। এ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু এসবের আড়ালে যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, তা হলো কে হবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু? পাকিস্তান, নাকি ভারত? চীনা আধিপত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ও তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়তে কে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করবে এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে কাজ করবে?
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এশিয়া সফরকে খুব শুভসূচনা বলা যায় না। গত জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও প্রতারণার অভিযোগ করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস মনে করে, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস এজেন্সি ও অন্য সামরিক শাখাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আদর্শিক জায়গা থেকে তালেবানকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা করে আসছে। এ ছাড়া আফগানিস্তানে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় তালেবানকে সহায়তা করছে। কংগ্রেস ৫০ কোটি ডলার সাহায্য বন্ধ করে দেয়। ১ সেপ্টেম্বর পেন্টাগন আরও ৩০ কোটি ডলার সামরিক সাহায্য বন্ধ করে দিলে মোট ৮০ কোটি মার্কিন ডলার পাকিস্তানের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পেন্টাগনের একজন মুখপাত্র বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার পরিকল্পনায় পাকিস্তানের নীতি সমর্থনযোগ্য নয় বলে এ সাহায্য বাতিল হলো।
পাকিস্তান অবশ্য এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ইমরান খান। তাই পম্পেও নতুনভাবে শুরু করতে চান। তিনি প্রথমেই ক্রিকেটার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইসলামাবাদ যান। তিনি ইমানের সঙ্গে ট্রাম্পের নীতিমালা প্রসঙ্গে কাজের কথা বলেন। ইমরান বলেন, ‘আমি মাঠে নেমেছি এবং আমি জয়ী হব।’ পম্পেও মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ডকে ইমরান বলেন, ‘খেলোয়াড় মানে আশাবাদী।’ পম্পেও পরে বলেন, তিনি সাক্ষাৎ উপভোগ করেছেন, তবে আবার সামরিক সাহায্য পেতে হলে পাকিস্তানকে ‘অনেক দূর যেতে হবে’।
পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে পিঠ চাপড়ে দিয়ে পম্পেও ছুটে যান নয়াদিল্লিতে। সেখানে ম্যাটিসের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। পম্পেও ও ম্যাটিসের সফরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় সামরিক চুক্তির বিষয়টি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সামরিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে একটি চুক্তিতে সই করেছে। এর ফলে মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পর্শকাতর অস্ত্রশস্ত্র কিনতে দিল্লির জন্য দরজা খুলে গেল। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে মার্কিন ও ভারতের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যকার এক বৈঠকের পর ওই চুক্তি সই হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের মধ্যে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্মকর্তারা জানান, যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও ‘কমিউনিকেশনস কম্প্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি চুক্তি’কে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের একটি ‘মাইলস্টোন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সীতারমণ বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রস্তুতি বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্র কেবল ৩০টি দেশের সঙ্গে এ চুক্তি করেছে। চুক্তির আওতায় ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যৌথ সামরিক মহড়া রয়েছে। ট্রাম্প পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবানকে সাহায্য করার অভিযোগ তুলে একটি চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে, যা ভারত লুফে নিয়েছে।
সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া নীতি সমর্থন করে ভারত। তিনি পাকিস্তানকে সীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধ করতে বলেছেন, যা আমাদের সঙ্গে মেলে।’ তিনি আরও বলেছেন, পাকিস্তান থেকে তৈরি সন্ত্রাসীরা ভারতকে আক্রমণ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রয়েছে।
তবে এর মধ্যেই একটি বিষয়ের কোনো মীমাংসা হয়নি। আর তা হচ্ছে রাশিয়া ও ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলারে অত্যাধুনিক এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কিনছে। এ ছাড়া তারা ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের উঠতি অর্থনীতির কথা বিবেচনায় কম দামে তেল কেনার যে সুযোগ ইরান দেয়, ভারত তা সংগত কারণেই হাতছাড়া করতে চাইছে না। ওই দুই চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দেবে কি না, তা নিয়ে কথা চলছে।
ওয়াশিংটনের চাপে যদি ভারত মাথা নত করে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখন ক্রেমলিনের জন্য পাকিস্তান হবে ভালো বিকল্প। তাদের সম্পর্ক আরও গাঢ় হবে। ওয়াশিংটন-দিল্লির ঘনিষ্ঠতায় রাশিয়া দ্রুত পাকিস্তানের কাছে ঘেঁষছে। পাকিস্তানি সেনাদের রাশিয়ায় প্রশিক্ষণে সম্মত হয়েছে তারা। এ ছাড়া পাকিস্তানে গ্যাস পাইপ লাইন ও আকর্ষণীয় দামে এলএনজি সুবিধা দেবে রাশিয়া।
একই সময় চীনও বসে থাকবে না। পাকিস্তানে চীন দীর্ঘদিন ধরেই অবস্থান করছে। তারা পাকিস্তানকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে। চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর এমন অবস্থান পৌঁছেছে যে পম্পেও মন্তব্য করেছেন, আইএমএফের দেওয়া সাহায্য চীনের ঋণ শোধ করতে পারবে না।
সমস্যা হচ্ছে, ট্রাম্পের ভারতের দিকে নুইয়ে পড়ার বিষয়টি পাকিস্তানকে চীন ও রাশিয়াঘেঁষা হওয়া ঠেকাতে পারবে না।
ট্রাম্প চাইছেন, পাকিস্তান যেন তালেবানদের সাহায্য করা বন্ধ করে। তালেবান জঙ্গিরা যাতে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আলোচনার টেবিলে বসে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ৮০ কোটি ডলার সাহায্য বন্ধ করে দিলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীকে ইমরান খান কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন, সে প্রশ্ন থেকে যাবে।
ট্রাম্পকে এটা বুঝতে হবে যে ট্রুমানে আমল থেকে চলে আসা প্রেসিডেন্টের ভারসাম্যের নীতি উপেক্ষা করে উপমহাদেশে ট্রাম্প তার নিজের মতো করে চলতে গেলে তা তাসের প্রাসাদের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
SHARE

Author: verified_user

0 comments: